করোনা ও মৌসুমি ফ্লু নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি

দেশজুড়ে করোনাভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে আবার সিজনাল ফ্লু শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সামান্য সর্দি, জ্বর বা গলা ব্যথার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে ছুটছে মানুষ। কিন্তু সেখান থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে চিকিৎসক ও নাসর্রা নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় সঠিকভাবে সেবা দিতে পারছেন না বলে দাবি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা জনসাধারণদের চিকিৎসকদের ওপর ভরসা রাখতে বলছেন। চিকিৎসক-নার্সদেরও বলছেন নিজেদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রোগীদের পাশে থাকতে।

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এমনকি রাজধানীর অত্যাধুনিক অনেক হাসপাতালেরই চিকিৎসকরা জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা চিকিৎসাসেবা দেবেন সেই চিকিৎসক এবং নার্সরাও সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) অভাবে রোগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

ডাক্তার, নার্সসহ সেবাকর্মীরা রোগীর কাছে আসছেন না, এমনকি কথাও বলছেন না। সারা দেশজুড়ে প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে। এতে মৌসুমি ফ্লুতে আক্রান্ত অথবা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমুনারি ডিজিজ (সিওপিডি) বা নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা বা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। রোগের বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারায় সঙ্কট আরো ঘনীভ‚ত হচ্ছে। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ডা. আজমল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি চিকিৎসক ডা. রকিবুল হাসান বলেন, মৌসুমি ফ্লুতে আক্রান্ত অথবা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমুনারি ডিজিজ (সিওপিডি) বা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হবার উপসর্গ নিয়ে কেউ যদি আসেন তাহলে কাউন্সেলিং করে পর্যাপ্ত মেডিসিন দিয়ে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। যেহেতু করোনা ভাইরাস শনাক্তের কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই তাই আমরা ঝুঁকি নিচ্ছি না।

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক (কমিউনিকেশন ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) ডা. সাগুফতা আনোয়ার বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে আসা কোনো রোগী আমরা ফিরিয়ে দেই না। তবে এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের কাছে আমরা জানতে চাই তাদের কোনো ভ্রমণের ইতিহাস আছে কিনা। অথবা তাদের পরিবারের কারো বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস আছে কিনা। বা সদ্য বিদেশ ফেরত কারো সংস্পর্শে এসেছেন কিনা। অবশ্য অনেকেই এসব তথ্য গোপন করতে চান। সেটাও আমরা বুঝতে পারি। যদি তাই হয় তাহলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেই। আপনারা কেন পরীক্ষা করছেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি সরকার নিয়ন্ত্রিত। সরকার যদি আমাদের পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয় তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

সরেজমিনে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসক নেই। অভিভাবকরা ভিড় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে আছেন। ডাক্তারের উপস্থিতি নেই। শিশুরোগী নিয়ে অনেককেই কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে। ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে থেকে বিনা চিকিৎসায় অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানা যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির মুখে দেশজুড়ে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। সামান্য অসুখেও উৎকণ্ঠিত মানুষ ছুটছে চিকিৎসক, হাসপাতাল বা পরীক্ষার খোঁজে। কিন্তু এসব জায়গা থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে তারা খুবই অসহায় বোধ করছে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের জায়গা থেকে যেমন ধোঁয়াশাজনক পরিস্থিতি রয়েছে, তেমনি চিকিৎসক-নার্সদের অনেকে ভয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তবে তাদের মনে রাখতে হবে, ঝুঁকি নিয়ে হলেও রোগীদের পাশে থাকাই তাদের ব্রত। চিকিৎসকগণ নোগীদের দূরে ঠেলে দিলে তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সাধারণ মানুষের বেশি আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটির প্রয়োজন নেই।

কারণ এরই মধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও ৮০ শতাংশের বেশি রোগীরই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন নেই। কেবল যাদের শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা আগে থেকে বিভিন্ন রোগের জটিলতা রয়েছে, তাদের হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। সেই সংখ্যাটা তুলনামূলক খুবই কম।

এ ক্ষেত্রে কাদের পরীক্ষা লাগবে না লাগবে সেটা চিকিৎসকদের ওপরই ছেড়ে দেয়া ভালো। চিকিৎসকরাই বুঝবেন কার সিজনাল ফ্লু আর অন্য কোনো ভাইরাসের লক্ষণ আছে কিনা। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সর্দি, কাশি ও জ্বরের রোগী দেখলেই ফিরিয়ে না দিয়ে বরং প্রকৃত উপসর্গ বোঝার চেষ্টা করুন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও পরীক্ষার পরিসর আরো বাড়ানো দরকার। তাতে মানুষের উদ্বেগ কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তা উপকরণও যতটা সম্ভব নিশ্চিত করতে হবে।

সরেজমিনে রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, মিরপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, আলোক হেলথ কেয়ার, কিংস্টোন হাসপাতাল, ডা. আজমল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে- জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে কোনো রোগী এলে সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।

মিরপুর ১২ নম্বর কিংস্টোন হাসপাতালের কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইমার্জেন্সি ডাক্তারদের বলা আছে জ্বর, সর্দি, কাশি ও হাঁচি নিয়ে কোনো রোগী এলে সরকারি কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেন রেফার করা হয়। গত সপ্তাহ থেকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই বলে আসছি যে ঢালাওভাবে সবার পরীক্ষা করার দরকার নেই। কারণ সিজনাল ফ্লু থেকেও সর্দি, জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা হয়ে থাকে। এর সঙ্গে যেহেতু করোনা ভাইরাস যুক্ত হয়েছে, তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী যাদের উপসর্গ কিছুটা বেশি বা জটিলতা দেখা দেয়, তাদের পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো দেশেই ঢালাওভাবে সবার পরীক্ষা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের অনেকেই হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে ভয় পাচ্ছেন। আমরা নার্সদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা উপকরণের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছি। কেবল যারা আইসিইউ, আইসোলেশন ইউনিট ও অপারেশন থিয়েটারের মতো এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন তাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ পিপিই ও বাকিদের জন্য পর্যাপ্ত মাস্ক বা হ্যান্ড গ্লাভস নিশ্চিত করতে হবে।’

জার্নাল বাংলা/সাইফুল

Facebook Comments
আরো পড়ুন
error: Content is protected !!