কোন পরিস্থিতিতে মহামারি ঘোষণা করা হয়?

বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। গুটিকয়েক দেশ বাদে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এর বিস্তার ঘটেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগী এবং মৃতের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ১১ মার্চ করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে একে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে। কিন্তু কেন এই ঘোষণা?

এর আগেও বিভিন্ন সময় পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। কিন্তু ‘বৈশ্বিক মহামারি’ ঘোষণা করা হয়নি। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বৈশ্বিক মহামারি কী? একটি রোগকে কখন বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করা হয়? চাইলেই কি কোনো রোগকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করা যায়?

বৈশ্বিক মহামারি জানতে হলে আগে মহামারি কী জানা জরুরি। অভিধানের ভাষায় মহামারি শব্দের অর্থ মড়ক। অর্থাৎ কোনো সংক্রামক রোগে যখন কাছাকাছি সময়ে বহু লোক মারা যায় তখন সেই অবস্থাকে মহামারি বলে। মহামারির পরের ধাপ হলো বৈশ্বিক মহামারি। এক্ষেত্রে রোগের বিস্তার এবং রোগীর সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং রোগটি দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে থাকে।

চাইলেই কিন্তু কোনো রোগকে মহামারি কিংবা বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনে কতগুলো রোগের কথা বলা আছে এবং কিছু শর্ত রযেছে, সেগুলোর সঙ্গে রোগটির ভয়াবহতা মিলে গেলে মহামারি ঘোষণা করা হয়। এই শর্তগুলোর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় ইবোলা বা সোয়াইন ফ্লুর মতো রোগগুলোকে বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে মহামারি ঘোষণা করা হয়েছিল।

এর অন্যতম শর্ত হলো, সহজভাবে বললে রোগটি যদি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে এবং এর জন্য যদি ব্যাপকভাবে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে মহামারি ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। এক্ষেত্রে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ গ্রহণ করে। কোনো সংক্রামক রোগ যদি নির্দিষ্ট একটি বা একাধিক দেশে বিস্তার ঘটায় এবং ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনের শর্তের আওতায় আসে তাহলে সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এরপর সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কমিটির মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ কতটা ছড়িয়েছে এবং সেই রোগে কত মানুষ আক্রান্ত হতে পারে বা মৃত্যুর হার বিবেচনায় নিয়ে মহামারি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। এরপর ১৯৪৯ সালে সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত প্রথম মহামারি হচ্ছে পোলিও। যুক্তরাষ্ট্রে সে সময় পোলিওতে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর ডব্লিউএইচও পৃথিবীতে বহুবার মহামারি ঘোষণা করেছে। চলমান একুশ শতকের প্রথম মহামারি ছিল নাইজেরিয়ায় কলেরা। ২০০১ সালে কলেরায় দেশটিতে চারশ লোকের মৃত্যু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রথম বৈশ্বিক মহামারি ছিল এশিয়ান ফ্লু। রোগটি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। আক্রান্ত অঞ্চল ছিল চীনের গুইঝু প্রদেশ থেকে সিঙ্গাপুর, হংকং এবং যুক্তরাষ্ট্র। এশিয়ান ফ্লুতে প্রায় দুই মিলয়ন লোকের মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কখনো মহামারি ঘোষণা করা হয়নি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ঘন বসতিপূর্ণ দেশগুলোতে প্রায় ২৮টি রোগ রয়েছে যেগুলো যেকোনো সময় মহামারিতে রূপ নিতে পারে।

মহামারি ঘোষণার সুবিধাও রয়েছে। কেননা তখন ওই বিষয়ে আর সাধারণ বা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন কার্যকর হয় না। কারণ সেটি বিশেষ পরিস্থিতি। তখন মহামারি মোকাবিলায় জরুরি ওষুধপত্র অন্য দেশ থেকে আনতে সুবিধা হয়। এক্ষেত্রে প্রচলিত নীতি মেনে চলতে হয় না। এছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসে। এতে কোনো বাধা থাকে না।

জার্নাল বাংলা/সাইফুল

Facebook Comments
আরো পড়ুন
error: Content is protected !!