দুর্যোগকালে চিকিৎসাদাতা ৬ নারী সাহাবি

জার্নাল বাংলা ডেস্ক

হজরত আয়েশা (রা.)

একজন অসাধারণ মুসলিম নারী ব্যক্তিত্ব। বাল্যকালেই তাঁর মাঝে ছিল মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও সৌভাগ্যের আভাস। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম মেধাবী নারী। রহমাতুললিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সর্বাধিক প্রিয় নারী। আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জাতুস সালাসিল যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। আমর (রা.) বলেন, ‘আমি তাঁর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট কোন লোক সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, আয়েশা (রা.)। আমি বললাম, পুরুষদের মাঝে কে? তিনি বললেন, তাঁর বাবা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮৫)

ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ইতিহাস, সাহিত্য, চিকিৎসায় তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। ইতিহাস ও সাহিত্যের শিক্ষা তো স্বয়ং বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। মুসা ইবনে আবু তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর তুলনায় বেশি বিশুদ্ধভাষী আমি আর কাউকে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮৪)। আর চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন দিগদিগন্ত থেকে রাসুল (সা.)-এর দরবারে আগত আরব গোত্রের প্রতিনিধিদলের কাছ থেকে। তা ছাড়া শেষ বয়সে রাসুল (সা.) প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। এ কারণে আরবের বিজ্ঞ হাকিম ও চিকিৎসকদের গমনাগমন চলতে থাকত। তাঁরা যখন যে ওষুধ বাতলে দিতেন, আয়েশা (রা.) সেগুলো শিখে নিতেন। উরওয়া (রহ.) বলেন, ‘আমি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আয়েশা (রা.) অপেক্ষা দক্ষ মানুষ দেখিনি। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, খালা! আপনি এই জ্ঞান কোথা থেকে অর্জন করলেন?’ তিনি বলেন, ‘আমি মানুষকে রোগীর চিকিৎসা করতে দেখেছি এবং তা মনে রেখেছি।’ (সিয়ারু আলামুন নুবালা : ২/১৮২)

ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেন প্রাণপ্রিয় পরম শ্রদ্ধেয় জীবনসঙ্গীর মোবারক সান্নিধ্য থেকে। রাসুল (সা.)-এর তালিম ও ইরশাদের যাবতীয় মজলিস অনুষ্ঠিত হতো মসজিদে নববীতে, যা তাঁর ঘরের সঙ্গে লাগানো। এ জন্য রাসুল (সা.) ঘরের বাইরেও সাহাবায়ে কেরামকে যা শিক্ষা দিতেন, হজরত আয়েশা (রা.) সেগুলোতে শরিক থাকতেন। দূরত্বের কারণে কোনো কথা বুঝতে অসুবিধা হলে পরবর্তী সময়ে তা রাসুল (সা.) থেকে বুঝে নিতেন। কখনো উঠে মসজিদের কাছে চলে যেতেন। নবী (সা.)-এর বহু হাদিস আয়েশা (রা.)-এর মাধ্যমে মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। তাঁর প্রখর স্মরণশক্তি এ কাজে সহায়ক হয়েছিল। আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের কাছে কোনো হাদিসের অর্থ বোঝা কষ্টসাধ্য হলে আয়েশা (রা.)-কে প্রশ্ন করে তাঁর কাছে এর সঠিক জ্ঞাত লাভ করেছি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮৩)

তিনি ছিলেন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন একজন নারী। তাঁর পবিত্র হৃদয় ছিল তেজস্বিতায় দীপ্ত, সাহসিকতায় ভরা। তিনিই রাসুল (সা.)-এর কাছে জিহাদে অংশগ্রহণ করার অনুমতি চেয়েছিলেন। যদিও রাসুল (সা.) তাঁকে জিহাদের অনুমতি দেননি। বরং বলেছিলেন হজই নারীদের জিহাদ। এর আগে যখন পর্দার বিধান ছিল না, তিনি বেশ কিছু বিজয়াভিযানে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বদরের যুদ্ধেও ছিলেন। ওহুদ যুদ্ধে যখন মুসলিম সৈন্যরা প্রায় পর্যুদস্ত, বীর লড়াকুদের পদও যখন টলমল, এমন ঝুঁকির মুখেও হজরত আয়েশা (রা.) দৌড়ে দৌড়ে আহত সৈনিকদের পানি পান করাচ্ছিলেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওহুদ যুদ্ধের একসময়ে সাহাবারা নবী (সা.) থেকে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবু তালহা (রা.) ঢাল হাতে নিয়ে নবী (সা.)-এর সামনে প্রাচীরের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়ালেন। আবু তালহা (রা.) সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। একনাগাড়ে তীর ছুড়তে থাকায় তাঁর হাতে ওই দিন দুই বা তিনটি ধনুক ভেঙে যায়। ওই সময় তীরভর্তি তীরাধার নিয়ে যে কেউ তাঁর নিকট দিয়ে যেত নবী (সা.) তাকেই বলতেন, তোমরা তীরগুলো আবু তালহার জন্য রেখে দাও। একসময় নবী (সা.) মাথা উঁচু করে শত্রুদের অবস্থা দেখতে চাইলে আবু তালহা (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি মাথা উঁচু করবেন না। হয়তো শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর এসে আপনার গায়ে লাগতে পারে। আমার বক্ষ আপনাকে রক্ষার জন্য ঢালস্বরূপ।’ আনাস (রা.) বলেন, ‘ওই দিন আমি আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আয়েশা (রা.)-কে এবং (আমার মাতা) উম্মে সুলাইমকে দেখতে পেলাম যে তাঁরা পরনের কাপড় এতটুকু পরিমাণ উঠিয়েছেন যে তাঁদের পায়ের গহনা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা পানির মশক ভরে নিজেদের পিঠে বহন করে এনে আহতদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। পুনরায় ফিরে গিয়ে পানি ভরে নিয়ে আহতদের পান করাচ্ছিলেন। ওই সময় আবু তালহা (রা.)-এর হাত থেকে (তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে) তাঁর তরবারিটি দুইবার অথবা তিনবার পড়ে গিয়েছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৮১১)। এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, হজরত আয়েশা (রা.) কঠিন বিপদের মুহূর্তে উম্মাহর পাশে থেকেছেন। তাদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।

পরিখার যুদ্ধে মুসলিমরা যখন অবরুদ্ধ, তখনো তিনি দুর্গ থেকে বের হয়ে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। (সীরাতে আয়েশা (রা.), পৃ. ১৮৫)

Facebook Comments
আরো পড়ুন
error: Content is protected !!