রাতের আঁধারে অসহায় মানুষের পাশে ওসমান পরিবার

ইসমাইল হোসেন মিলন, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

মহামারী করোনাকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে জেলার ঐত্যিবাহী ওসমান পরিবার। দল মত নির্বিশেষে মানুষের আস্থা অর্জন করে অতীতের মত করেনাকালে ত্রাণ সহায়তা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিরূপণ করতে কোথাও তিল পরিবার ছাড় দেননি তারা।

পরিবারের সদস্যরা খাদ্য, স্বাস্থ্য এমনকি করোনা রোগীসহ নানা ব্যাধিতে মৃত মানুষের লাশ দাফন, কাফন, জানাযা ও সৎকার নিশ্চিত করতে পৃথক পৃথক টিম নামিয়ে দিয়েছেন মাঠে।

করোনার প্রথম থেকেই ওসমান পারিবারের ঘোষণা ছিল, একটি মানুষ যেন উপোস না থাকে।

চিকিৎসা না পেয়ে মানুষ যেন পথে ঘাটে না মরে। কেউ যদি মারা যায়, মরার পর লাশ যেন পড়ে না থাকে। এই রকম অর্ধশত উদ্যোগ নিয়ে এখন অবদি মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে ওসমান পরিবারের সহস্রাধিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী।

আর এসব সেবায় স্বেচ্ছাসেবীদের পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই বার্তা, তা হলো- সেবা পৌঁছাতে কে আওয়ামী লীগ কে বিএনপি করে তা যেন প্রাধান্য নয়।

বর্তমানে এসব সেবা পৌঁছাতে গঠন করা হয়েছে মোবাইল বিকাশ টিম, মোটরসাইকেল ইমার্জেন্সি টিম, অটো রিকশা ও ভ্যান টিম, কবরস্থান ও সৎকার টিম।

করোনা মহামারি শুরুর প্রাক্কালে ওসমান পরিবারের জনপ্রতিনিধি দুই এমপির পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন শামীম ওসমান পত্নী ও জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সালমা ওসমান লিপি এবং পুত্র ইমতিনান ওসমান অয়ন। জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের মাধ্যমে ১০ হাজার স্যানিটাইজার, ১০ হাজার মাস্ক প্রদান করেন তারা। সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডসহ ফতুল্লা এলাকায় ওসমান পরিবারের নির্দেশে ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে জীবাণুুনাশক পানি ঢালা হয় শত শত সড়কে এবং ৫ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

এদিকে সাধারণ ছুটি বৃদ্ধি করার পর কর্মহীনদের খাদ্যের অভাব অতিমাত্রায় শুরু হলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কর্মহীন ও বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশে এগিয়ে আসেন জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ও এমপি শামীম ওসমানের স্ত্রী সালমা ওসমান লিপি। গত এক মাসে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর ও শহর এলাকায় রাতের আঁধারে প্রায়ই সালমা ওসমান লিপির ব্যক্তিগত অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী উপহার পাঠানো হয়। কে না খেয়ে আছে এ খবর নিতে লিপি ওসমানের ১২ সদস্যের মোটরসাইকেল টিম ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত রয়েছে। ওসমান পরিবারের পুত্রবধূ তার নিজস্ব ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে প্রতিদিন অসংখ্য ম্যাসেজ পেয়ে রাতের আঁধারে মধ্যবিত্তের ঘরে মোটরসাইকেল টিম ও গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে ঘরে পৌছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী।

শামীম ওসমানের সহধর্মীনি সালমা ওসমান লিপি ও ছেলে অয়ন ওসমানও অসহায় কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী দিয়েছেন। এছাড়াও আগামী ঈদকে সামনে রেখে ডিজিটাল উপায়ে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের কাছে নগদ ২ কোটি টাকা প্রেরণের কাজ শুরু করেছে ওসমান পরিবার।

অপরদিকে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজের নির্বাচনী এলাকায় ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেন শামীম ওসমান। এর মধ্যে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে কর্মহীন ও মধ্যবিত্ত ২০ হাজার পরিবারের মাঝে রাতের আঁধারে দ্বারে দ্বারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন তার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সংগঠন, নানা শ্রেণি পেশার ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে নগদ ৪০ লাখ টাকা অর্থ সহায়তাও দেন। গণমাধ্যম, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য সহায়তায় নিযুক্তদের মাঝে ৫০০ পিস পিপিই সরবরাহ করা হয় শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত অর্থায়নে।

এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ নগরীর কর্মহীন হয়ে পড়া প্রায় এক হাজার হকার পরিবার ও পরিবহন সেক্টরের প্রায় ২ হাজার পরিবারকেও খাদ্যসামগ্রী দেন শামীম ওসমান। এর পাশাপাশি শামীম ওসমানের আহ্বানে তার সমর্থক দলীয় নেতা ও স্বেচ্ছাসেবীরা ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় মোট ৩৮ হাজার ৫শ পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ।

অন্যদিকে ওসমান পরিবারের আরেক সন্তান বিকেএমইএ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নিজের সংসদীয় আসনে মোট ১২০ মেট্রিক টন চাল দিয়েছেন। যা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে ২০ হাজার পরিবারসহ নারায়ণগঞ্জে করোনা চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার ও নার্সদের সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৭টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান ও ৭টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে রোজার মাসটিতে ৬০০ শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০ হাজার পরিবারকে ৯০০ টাকা করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে বিকাশ বা নগদ একাউন্টে প্রেরণ করা হবে। ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মৃতদের দাহ এবং দাফনের ব্যবস্থা করায় ১০ লাখ টাকা সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া ডাক্তার নার্সদের থাকা খাওয়া এবং যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আরো ২০ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগীতা প্রদান কর্মসূচীর কাজ চলছে।

এছাড়া এ কর্মসূচীর আওতায় সেলিম ওসমান ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ৬৩ লাখ টাকা প্রদান, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ৯৯ লাখ টাকা, উপজেলা পরিষদ এলাকায় ৯ লাখ টাকা, স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মানী ভাতা ২৭ লাখ টাকা, ডাক্তার নার্সদের জন্য ২০ লাখ সর্বমোট ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা পর্যায়ক্রমে প্রদান করা হচ্ছে। এর আগে ৭টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং কাউন্সিলরদের মাধ্যমে এলাকার নিম্ন মধ্যবিত্ত প্রায় ১৩ হাজার মানুষের মাঝে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০ কেজি করে ১ লাখ ৩০ হাজার কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জে করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে প্রথম থেকে কোমর বেঁধে মাঠে নামেন ওসমান পরিবারের দুই এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান। জেলাকে লকডাউন করতে অনুরোধ জানান প্রশাসনকে। পরপর দুইবার ফেসবুক লাইভে এসে হাতজোড় করে জেলাবাসির জন্য করোনা ল্যাব স্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।

শামীম ওসমানের আহ্বানে ৪টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নমুনা সংগ্রহের জনবল দেওয়া হয় এবং তাদের সহায়তায় ব্যক্তিগত অর্থায়নে নমুনা সংগ্রহকারীদের জন্য ২টি সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স দেন শামীম ওসমান। তার প্রচেষ্টায় ও দাবীর প্রেক্ষিতে দেশে প্রথমবারের মত নারায়ণগঞ্জে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের প্রতিষ্ঠানকে করোনা উপসর্গ থাকা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দেয় সরকার।

করোনা হাসপাতাল স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করেন নব নির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যজিস্ট্রেট ভবন। শামীম ওসমানের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ তিনশ শয্যা হাসপাতালকে করোনা হাসপাতাল হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া দুই এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের থাকার জন্য নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, ডাক বাংলো একটি স্কুলে বসবাসের মান সম্পন্ন স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেখানে থাকার ব্যবস্থা, খাবারের ব্যবস্থা বাবদ নগদ ২০ লাখ প্রদান করা হয়েছে।

এদিকে ওসমান পরিবারের এই জন সম্পৃক্ততা বেশ সাড়া ফেলেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সবার মুখে মুখে ওসমান পরিবারের নাম। দলমত নির্বিশেষে ওসমান পরিবারের এই পাশে দাঁড়ানোর কথা স্বীকার করছেন সকলেই।

এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনা বীর উপাধি পাওয়া সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার জানিয়েছেন, করোনা ইস্যুতে স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ তাদের পরিবার যে ভূমিকা রেখেছে তা প্রশংসনীয় ও দৃষ্টান্তমূলক। সবাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে উনাদের মত এগিয়ে আসলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া কষ্টসাধ্য হবে না।

জেলা স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক ডা. দেবাশীষ সাহা জানান, চিকিৎসকসহ করোনা স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিতরা যেভাবে আক্রান্ত হয়েছেন তাতে আমরা সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে আছি। তারপরও আমরা কাজ করছি কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করার পেছনে দুই সাংসদের যে অবদান রয়েছে তা এই জেলার চিকিৎসক সমাজ কখনও ভুলবে না।

নারায়ণগঞ্জ কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ ড. প্রফেসর শিরিন বেগম জানান, ঐতিহ্যবাহী এই পরিবার সর্বদাই জনসাধারণের পাশে ছিলেন বলেই তারা কয়েক পুরুষ ধরে রাজনীতিতে ও জাতীয় সংসদে অবস্থান ধরে রেখেছেন। করোনার এই চরম পরিস্থিতিতে পুরো ওসমান পরিবার যে অবদান রেখেছে এবং রাখছে তা পুরো দেশের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

Facebook Comments
আরো পড়ুন
error: Content is protected !!