ঈদের আগেই চলবে ট্রেন

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি চলছে। এর আগে ২৪ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে সারাদেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও কন্টেইনার ছাড়াও ১ মে থেকে চালানো হচ্ছে পার্সেল ট্রেন। তবে এবার যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। এর আগেও একাধিকবার ট্রেন চালানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু দফায় দফায় সাধারণ ছুটি বাড়ার কারণে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়।

তবে এবার ঈদের আগে হাতেগোনা কয়েকটি ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া রেলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ১৪টি শর্ত পালন সাপেক্ষে ট্রেন চলাচলের অনুমতি আসতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মেনে ট্রেন চালানোর নির্দেশনা পাওয়ার পর দেশের সব স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে রেলের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ। এ ছাড়া ঈদে যাত্রীদের জন্য কোনো দাঁড়ানো টিকিট দেয়া হবে না। আর টিকিট বিক্রি হবে অনলাইনে। যাত্রীদের বসানোও হবে আসন ফাঁকা রেখে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট আসনের অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ট্রেন চালানো হবে। যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা স্থগিত করায় রেলওয়ের প্রতিদিন চার-পাঁচ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। রেলওয়ে সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় ও রেল ভবনের নির্দেশনার পর দেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনে চিঠি পাঠান বাণিজ্যিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রেলওয়ে পূর্বা লের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও-ঢাকা) মো. শওকত জামিল মোহসীর পাঠানো পত্রে নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ঈদের আগে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়।

চিঠিতে ট্রেনগুলো জীবাণুমুক্ত করা ছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের আগে সেগুলোকে চলাচলের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের শর্তে ঈদুল ফিতরের আগে সীমিত পরিসরে ট্রেন চলাচলের অনুমতি আসতে পারে। ফলে অনবোর্ড পরিচালিত ট্রেনগুলোর দরজা-জানালা, হাতল, সিট, হেড বেল্ট, কভার, টয়লেট, মেঝে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে।

ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানকে খাবারের গাড়ি সুষ্ঠুভাবে পরিচ্ছন্ন করে স্বাস্থ্য ও মানসম্মত খাবার পরিবেশন করতে হবে। ট্রেনে ভ্রমণকালে প্রত্যেক যাত্রীকে আবশ্যিকভাবে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহারে স্টেশনগুলোর মাইকে ঘন ঘন ঘোষণা দিতে হবে, বড় অক্ষরে লিখে কাউন্টারের সামনে টানিয়ে দিতে হবে।

ইস্যুকৃত টিকিটের ওপর ‘ট্রেনে ভ্রমণকালে প্রত্যেক যাত্রীকে আবশ্যিকভাবে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে’ মোটা সিল মেরে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। সর্বোপরি স্টেশনের দায়িত্ব পালনকালে প্রত্যেক কর্মচারীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, করোনার এ সময় এখনই সব ট্রেন চালানোর মতো পরিস্থিতি নেই। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের সুবর্ণ এক্সপ্রেস, মেইল ট্রেনসহ কয়েকটি ট্রেন চালানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পশ্চিমা ল রেলেও নির্ধারিত কয়েকটি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রেন চলাচলের অনুমতি মিলতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই স্ট্যান্ডিং টিকিট অর্থাৎ আসন সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা হবে না। তবে সবকিছু নির্ভর করছে মন্ত্রণালয় থেকে চ‚ড়ান্ত নির্দেশনা আসার ওপর।

তারা জানান, ট্রেন পরিচালনা নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে, যদিও সেখানে সংশ্লিষ্ট সবাই উপস্থিত থাকতে পারেননি। ট্রেন পরিচালনার পক্ষে-বিপক্ষে মতামত এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ১৫ মের মধ্যে পুরো রেল ব্যবস্থা সচল করার জন্য।

কেউ বলেছেন, সীমিত কিংবা শর্ত ও নির্দেশনা মেনে ট্রেন পরিচালনা করলেও সাধারণ যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বিশেষ দূরত্ব রেখে বসা, ট্রেনে ওঠা কিংবা টিকিট কাটা সাধারণ যাত্রীরা কতটুকু মানবেন। সাধারণত ট্রেনে নির্ধারিত যাত্রীর তুলনায় দু-তিন গুণ বেশি যাত্রী চলাচল করে। নির্ধারিত আসন ছাড়াও যাত্রীরা, ট্রেনের ভেতর, দুই বগির সংযোগস্থল, ইঞ্জিন ও ছাদে ভ্রমণ করেন।

সম্প্রতি গণপরিবহন বিশেষত ট্রেন পরিচালনার জন্য ১৪টি বিশেষ নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে যাত্রী ও কর্মীদের মাস্ক ও গ্লাভস পরিধান, তাপমাত্রা পরিমাপ, সম্পূর্ণ ট্রেন ও স্টেশন নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে ফেলা, স্টেশনে হাতে তাপমাত্রা পরিমাপ যন্ত্রের ব্যবহার, অনলাইন টিকিট ক্রয়ে উৎসাহ প্রদান, পোস্টার ও ইলেকট্রনিক স্ক্রিনে স্বাস্থ্যজ্ঞান পরিবেশন, যাত্রীদের বসার স্থান পরিচ্ছন্ন রাখা, মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে চলাচলরত ট্রেনের ক্ষেত্রে যাত্রী নিয়ন্ত্রণসহ ১৪টি বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রী পরিবহন করা খুবই জটিল হবে। ট্রেন যাত্রীরা কোনো সময়ই ভ্রমণের ক্ষেত্রে খুব একটা নিয়মনীতি মানেনি। তবে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, কোনো স্টেশন থেকেই যেন টিকিট না দেয়া হয়। শতভাগ টিকিট অনলাইনেই বিক্রি করা হবে। টিকিটবিহীন কোনো যাত্রী স্টেশনেই প্রবেশ করতে পারবে না।

রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘২৫ মার্চ থেকেই যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও আমরা মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করছি। বর্তমানে ধীরে ধীরে পোশাক কারখানা চালুসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতার পথে হাঁটছে সরকার। আমরা ট্রেন চালাতে সব সময়ই প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা পাওয়া গেছে লাগেজ ভ্যান ট্রেন চালানোর জন্য। লাগেজ ভ্যান, বিভিন্ন যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে একটি করে ‘লাগেজ ভ্যান’ কোচ চালানো হতো। এখন আমরা পুরো একটি ট্রেনই শুধু লাগেজ ভ্যান দিয়ে চালাব। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে রেল বন্ধ থাকায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়েছে।’

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ট্রেন পরিচালনার নির্দেশনা পেলে আমরা তা করব। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছি। করোনার সময়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হলে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, দূরপাল্লার ট্রেন পরিচালনা করলে একেকটি কোচে থাকা আসন সংখ্যার বিপরীতে অর্ধেক কিংবা তার বেশি সিট খালি রেখে টিকিট বিক্রি করব। অর্থাৎ নির্ধারিত দূরত্ব রেখে রেখে যাত্রীদের বসানো হবে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে ট্রেন চলাচল। তবে বিষয়টি যেহেতু একেবারেই নতুন, আমরা কতটুকু সফল হব বলা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে।’

সচিব আরো বলেন, ‘যাত্রীবাহী ট্রেন কবে থেকে চলাচল করবে এ সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি। সরকার লকডাউন তুলে দিয়ে ট্রেন পরিচালনার নির্দেশনা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তা শুরু করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’

রেলওয়ে মহাপরিচালক শামছুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কিন্তু মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করছি। ফলে রেলপথ সচল এবং প্রতিটি স্টেশনেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের নির্দেশনা পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হবে।’

Facebook Comments
আরো পড়ুন
error: Content is protected !!